তাবারক হোসেন আজাদ: প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ানোর শখ সেই ছোটকাল থেকে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শহরে স্বাস্থ্যকর্মী আঙ্কেলের ওষুধের দোকানে তখন প্রিয় পত্রিকা যুগান্তর রাখা হতো, সেটাতে প্রতি সপ্তাহে ভ্রমণ বিষয়ক একটা পাতা থাকতো। আমি তা মনযোগ দিয়ে পড়তাম এবং পেপার কাটিং করে সেগুলো সংগ্রহ করে রাখতাম আর ভাবতাম বড় হয়ে আমিও এসব জায়গায় ঘুরতে যাব। বড় হলাম, সেই কমন ডায়ালগ—‘মা-বাবার একটাই কথা-কষ্ট করে পড়া-লেখা শেষ কর-তখনই ঘুরতে পারবে।’
মহান আল্লাহ হয়তো আমার এ হা-হুতাশ দেখেই আমার জন্য দৈনিক আজকের কাগজ থেকে যুগান্তরে সাংবাদিকতা এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকুরী ঠিক করে দিলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমার জীবনে কয়েকজন বন্ধুর পরিচয় হলো। তাদের ২/৩ জনের সাথে অনেক জায়গা দেখার সৌভাগ্য হয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য মন ভরে উপভোগ করতে পেরেছি। বিভিন্ন এলাকার মানুষের খাবার, কথাবার্তা, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা, যেটা নিজে কাছ থেকে না দেখলে কখনই অনুধাবন করা যাবে না।
৫ বছর আগে বান্দরবান প্রথম ট্যুর আমার। সাথে ছিলো ছোট ভাই ইত্তেফাকের সাংবাদিক এম আর সুমন। আমাদের প্রথম ট্যুর, তাই অনুভূতিটাও ছিল অন্যরকম। আমার প্রিয় বন্ধু বান্দরবানের থানচি উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন রিংকু। তিনি তার সরকারি গাড়ি ও একজন লোক দিয়ে নীল গীরি, নীলাচল, বৌদ্ধ মন্দির-সহ আরো কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়ালেন। কিন্তু তখনি ঝরনা দেখার অভিজ্ঞতা ছিলোনা।
এইবার (শুক্রবার/২৭ আগষ্ট ২০২১) ভোর বেলায় পৌঁছলাম বান্দরবান শহরে। সকাল ৯টায় গাড়ি নিয়ে ছুটলাম ঝড়নার দেখা উদ্দেশ্যে। বোয়াংছড়ির আলেক্ষ্যংয়ের শিলবান্ধা এলাকায় সেনাবাহিকে সাক্ষাতকার দিয়ে পাড়ারে হেটে চললাম আমরা ১৬ বন্ধু। তবে মাঝ পথে আমার বন্ধু যুব নেতা পৌরসভার কর্মকর্তা কামরুল হাসান রাসেলকে নিয়ে দুঃচিন্তায় ছিলাম। কারন সে অধিক স্বাস্থ্য নিয়ে হাটাচলা ছিলো বড়ই কষ্টের। তারপরও সে গাইডের সহযোগিতায় তিন পাহাড় অতিক্রম করে ঝড়নায় পৌঁছে আমাদের সাথে।। কতই না কষ্ট, জীবনের প্রথম ঝরনার দেখা। তবে সেই প্রথম দেখাতেই আমি ঝরনার প্রেমে পড়ে যাই। দলবদ্ধ (১৬ জন) হয়ে-গভির জঙ্গল, উঁচু উঁচু বিশাল বিশাল পাহাড় পাড়ি দিয়ে দেবতাকুম দেখা শেষ করে, নাই অয়িং ও শীলবান্ধা ঝড়নার সামনে হাজির। ওফ- কত কষ্ট- তবে সার্থক হলো। আবার ফিরে আসাতে পাহাড়ে না উঠে, আতংক নিয়ে নদীর পাশে দিয়ে গাইডের সহযোগিতায় হেঁটেই কচ্ছফতলি সেনা ক্যাম্পের সামনে হাজির হই। চাঁদ গাড়ি করে সন্ধায় বৃষ্টিতে ভিজে শহরে আসি।।
ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন আমরা নিজেদের মতো করে শহরের কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখি। কেনাকাটা করার জন্য জায়গাটা তেমন সুবিধার না, এর পরও টুকটাক কিছু কেনাকাটা করে নিই। পাহারের সবকিছুই ভালো লেগেছে, শুধু খাবার ছাড়া। কারণ হালাল খাবার এতটা সহজলভ্য না। তিনদিন রুটি, ভাত, সবজি আর ফলমূল খেয়েই ছিলাম আমরা।

পরদিন যাই বান্দরবানের নীলগীরি, নীলাচল, চিম্বুক পাহাড়সহ কয়েকটি স্থানে । পর্বত মেঘালয় ভ্রমণের এটাই ছিল বেস্ট পার্ট। সারা দিন আমাদের চারপাশে ছিল মেঘের আনাগোনা। মেঘ কখনো আমাদের একটু উপরে, কখনো আমাদের নিচে, কখনো আমাদের গাড়ির ভেতর ঢুকে বসে আছে আবার কখনোবা আমরাই মেঘের ভেতর ডুবে গিয়েছি। দূর আকাশের তুলার মতো মেঘ ছুঁয়ে দেয়ার যে প্রবল ইচ্ছা, সেটা পূরণ হওয়ার অনুভূতি লিখে প্রকাশ করার মতো নয়। শীতল মেঘের স্পর্শের কথা চিন্তা করলে এখনো হূদয় শান্ত হয়ে যায়। আফসোস মেঘের কারণে এ দুটি বিখ্যাত ঝরনার একটাও দেখা হয়নি। মেঘেরা ঝরনাগুলো ঢেকে রেখে তাদের চেহারা দেখানোতেই ব্যস্ত ছিল।
কক্সবাজারসহ-তিনদিনের ভ্রমণ শেষে আসার পথে মেঘগুলো যেন বিদায় দিয়ে বলছিল আবার এসো আমাদের ঘরে। আমি হেসে বলে এসেছি, কষ্ট হয়েছে, তবে জঙ্গলের ঝরনাতে না, তোমাদের আদর ছুঁয়ে নিতে আবার আসব।
জীবনটাকে উপভোগ করার জন্য কিছুটা সময় সবারই দেয়া উচিত। ব্যস্ততা তো থাকবেই, ব্যস্ততা জীবনেরই অংশ। তাই বলে কি ব্যস্ততা নিয়েই জীবন কাটাতে হবে ? কখনই না। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের জন্য ভ্রমণ করার সুযোগ সহজে আসে না। পড়ালেখা, চাকরি, সংসার, বাধা-নিষেধ… একটা না একটা ঝামেলা থাকেই। এর মাঝেই সময় বের করে নিতে হবে। শুধু নিজের জন্য। ভ্রমণ করে আপনি যে প্রশান্তিটা পাবেন, যে স্মৃতিগুলো মনে ধারণ করবেন, সেটা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না, কখনই না।
তিনদিনের ভ্রমনে ১৬ বন্ধু ছিলেন, সমাজ সেবক আলিম উল্যাহ পিন্টু, সাংবাদিক মাহবুবুল আলম মিন্টু, স্বেচ্ছাসেবি সংগঠক আবদুর রহমান তুহিন, সাংবাদিক তাবারক হোসেন আজাদ, যুব নেতা কামরুল হাসান রাসেল, হোমিও ডাক্তার জাফর হোসেন, সাবেক ইউপি সদস্য নজরুল হোসেন, আ’লীগ নেতা মোঃ পেয়ার আলী, ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন, মোঃ রাজা, জহির হোসেন, মোঃ কাইছার, মোঃ ফয়েজ, পিআইও কার্যালয়ের অফিস সহায়ক শুভ চন্দ্র, মোঃ অপু ও প্রবাসী মোঃ জসিম হোসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.